আগামীকাল সাওডং পাড়া ছেড়ে চলে যাব। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত, আমরা তুলনামূলক নিরাপদ পাহাড়ি ঢালের ওপর তৈরি একটি মাচায় বসে আছি। পূর্ণিমার চাঁদ মাথার ঠিক ওপরেই ঝুলছে। সারাদিনের কঠিন ট্রেকিংয়ের পর পেটে পড়েছে সামান্য কিছু নাস্তা, রাতের খাবার তখনও রান্না হচ্ছে।
সেই মুহূর্তে মনে পড়ে গেল সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার লাইন—"পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।" ক্লান্ত শরীর, নীরব পাহাড় আর বিশাল চাঁদ—সব মিলিয়ে মুহূর্তটি ছিল অন্যরকম। এখানে শুধু আমরা নই, আরও কয়েকটি দল রাত কাটাচ্ছে। কেউ গান গাইছে, কেউ গল্প করছে।
হঠাৎ চোখে পড়ল একটি বাড়ির ওপর টাঙানো এন্টেনা। মনে হলো, এখান থেকে ফোনে কথা বলা যাবে। গত দুই দিন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। ইন্টারনেট বা মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। প্রথমবার ডায়াল করতেই ওপাশ থেকে ফোন ধরলেন আমার আপা। তার কণ্ঠে উদ্বেগ ছিল। বুঝলাম, দূরে থাকা মানুষগুলো চিন্তায় ছিলেন।
রাতের খাবারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন আমাদের গাইড। তিন বন্ধুকে নিয়ে গেলাম পাড়ার সর্দারের বাড়িতে রান্নার জায়গায়। খাবারের প্রতি বেলায় আলুভর্তা থাকত এবং রাতে মুরগি। পাহাড়ে বেড়ে ওঠা মুরগির শরীর শক্তপোক্ত।
তৃতীয় দিনে পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন এলো। আগের পরিকল্পনা ছিল শৈনগং ঝর্ণা দেখে নাফাখুমের দিকে যাত্রা করা। তবে শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনায় ব্যাগ বহনের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হলো। সকালের ঝর্ণা দেখা তুলনামূলক সহজ ছিল, কিন্তু নামার সময় পরিচিত পাহাড়ি পরীক্ষা ছিল।
পথে ঘটে গেল আরেক অভিজ্ঞতা। পেছনে থাকা এক বন্ধুকে জোঁকে ধরল। আতঙ্কিত হয়ে হাত-পা ছোড়াছুড়ি শুরু করল। পরে সবাই নিজেদের জোঁকের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছিলাম।
সাওডং পাড়া থেকে বিদায়ের সময় পাড়ার একটি দোকানের ব্যানারে চোখ পড়ল। সেখানে পাড়ার নাম লেখা ছিল 'সাং ওডং পাড়া'। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী নাফাখুমের পথে হাঁটা শুরু করলাম।
পাড়াবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ভাষা। বড়দের অনেকেই বাংলা ভাষায় স্বচ্ছন্দ নন, আর ছোটদের অনেকেই বাংলা বলতে পারে না। বিদায়ের মুহূর্তে শুকনা খাবার উপহার দিয়ে আন্তরিকতা অনুভব করলাম।
পড়ন্ত বিকেলে নাফাখুমে পৌঁছালাম। প্রথম দেখায় কিছুটা হতাশ হলাম। কিন্তু ভোর হওয়ার পর বদলে গেল সব ধারণা। নিস্তব্ধ প্রকৃতি, চারপাশে পাহাড় আর পানির শব্দ। ঝুলন্ত ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে জলপ্রপাতের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, জায়গাটির সৌন্দর্য আসলে অনুভব করতে হয় নির্দিষ্ট মুহূর্তে।