সোমবার, ০২ মার্চ, ২০২৬
ব্রেকিং
ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা ইরানের পাল্টা হামলা: কাতার ও বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যে বিস্ফোরণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানে বিস্ফোরণ, তেহরানে আতঙ্কের ছায়া খুলনার যুবদল নেতা মুরাদ খাঁ হত্যাকাণ্ডে চাঞ্চল্য পাকিস্তানের হামলার বিরুদ্ধে আফগান তালেবানের পাল্টা প্রতিরোধ ঝিনাইদহে নিখোঁজ তাবাসসুমের মরদেহ সেফটিক ট্যাংক থেকে উদ্ধার সিলেট মহানগর জামায়াতের উদ্যোগে হতদরিদ্রদের মাঝে ছাগল বিতরণ জুলাই আন্দোলন হত্যা মামলায় জামিন পেলেন আইভি রহমান ও আব্দুর রহমান বদি রমনা থেকে স্কুলছাত্র অপহরণ: প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে উদ্ধার ৪ গ্রেফতার টঙ্গীতে পরিত্যক্ত আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে নতুন ব্যানার টানানো হলো
রাজনীতি

ভারতের কাশ্মীর নীতিতে ইসরায়েলের আদর্শের প্রভাব উন্মোচিত

ভারতের কাশ্মীর নীতিতে ইসরায়েলের আদর্শের প্রভাব এবং মুসলিমদের উপর নির্যাতন উন্মোচিত।

ভারতের কাশ্মীর নীতিতে ইসরায়েলের আদর্শের প্রভাব উন্মোচিত

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিযুক্ত ভারতের তৎকালীন কনসাল জেনারেল সন্দীপ চক্রবর্তী ২০১৯ সালের নভেম্বরে একটি ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে ক্যামেরায় ধরা পড়েছিলেন। সেখানে তিনি ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে নয়াদিল্লিকে ‘ইসরায়েলি মডেল’ গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে কাশ্মীরের লাখ লাখ মানুষ এক ভয়াবহ সামরিক অবরোধ এবং যোগাযোগের সব ধরনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলেন। হিন্দুত্ববাদী বিজেপিদলীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার ২০১৯ সালে সন্দীপের বক্তব্যের কয়েক মাস আগেই কাশ্মীর অঞ্চলের আধা স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা কেড়ে নিয়েছিল। মোদি সরকার হাজার হাজার মানুষকে কারাগারে ভরেছিল, যাঁদের মধ্যে ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতারাও ছিলেন। এমনকি ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত কাশ্মীরি নেতাদেরও তখন আটক করা হয়েছিল।

নিউইয়র্কে নিযুক্ত ভারতের এই জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের কট্টরপন্থী অবৈধ বসতি স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তিনি এই আলোচনা তুলেছিলেন ১৯৮৯ সালে কাশ্মীরি হিন্দুদের দেশত্যাগের প্রেক্ষাপটে। হিমালয় অঞ্চলে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর হাজার হাজার কাশ্মীরি হিন্দু তাঁদের জন্মভূমি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। সন্দীপ ওই অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘এটি মধ্যপ্রাচ্যে ঘটেছে। ইসরায়েলিরা যদি এটি করতে পারে, আমরাও পারি’। তিনি যোগ করেন, মোদি সরকার এটি করতে ‘দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’।”

ছয় বছর পর সন্দীপ চক্রবর্তীর কথাগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সত্য মনে হচ্ছে। আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে মোদি যখন তাঁর দ্বিতীয় ইসরায়েল সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন দেখা যাচ্ছে এই দুই দেশ কেবল বন্ধুত্ব, বাণিজ্য এবং সামরিক অংশীদারত্বের মধ্যেই আবদ্ধ নয়। বিশ্লেষকদের মতে, তারা শাসনের নির্দিষ্ট কিছু মডেলেও একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেছে। মোদির সরকার ক্ষমতায় আসার পর ফিলিস্তিনিদের প্রতি দীর্ঘদিনের সমর্থন বিসর্জন দিয়ে খোলাখুলিভাবে ইসরায়েলকে গ্রহণ করেছে ভারত। তাঁদের মতে, নয়াদিল্লি ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের নিরাপত্তা, নিপীড়ন এবং প্রশাসনিক পদ্ধতির একাধিক উপাদান আমদানি করেছে। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেগুলো অভ্যন্তরীণ নীতিতে প্রয়োগ করছে।

গান্ধী আশ্রমের বইয়ে দর্শনার্থী হিসেবে বার্তা লিখছেন কট্টরপন্থী ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এ সময় তাঁর এক পাশে স্ত্রী সারা নিতানিয়াহু এবং অন্য পাশে ভারতের বিজেপিদলীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১৭ জানুয়ারি ২০১৮, আহমেদাবাদ

বিশ্লেষকদের মতে, এই গভীর সম্পর্কের মূলে রয়েছে একটি অভিন্ন আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি। মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মূল ভিত্তি হলো ‘হিন্দুত্ব’ নামক এক দর্শন, যা ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায় এবং বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের হিন্দুদের জন্য একে একটি স্বাভাবিক মাতৃভূমি হিসেবে বিবেচনা করে। ঠিক একইভাবে ইসরায়েল নিজেকে ইহুদিদের মাতৃভূমি হিসেবে দেখে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত ‘হোস্টাইল হোমল্যান্ডস: দ্য নিউ অ্যালায়েন্স বিটুইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইসরায়েল’ বইয়ের লেখক আজাদ এসা বলেন, ‘মোদির অধীনে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক হলো এমন দুটি আদর্শের বন্ধন, যারা নিজেদের সভ্যতাগত প্রকল্প হিসেবে দেখে এবং মুসলিমদের জনসংখ্যাগত ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে।’

এসা আল-জাজিরাকে বলেন, তাদের শ্রেষ্ঠত্ববাদী লক্ষ্যগুলো একই রকম বলে এই বন্ধুত্ব কাজ করছে। মোদির অধীন ভারত ও ইসরায়েল কৌশলগত অংশীদার হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় দিল্লি ইসরায়েলকে একটি আদর্শ মডেল হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। ইসরায়েল থেকে ভারতের শিক্ষা নেওয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো নরেন্দ্র মোদির দলের তথাকথিত ‘বুলডোজার জাস্টিস’ বা বুলডোজারের মাধ্যমে বিচার। গত এক দশকে হিন্দুত্ববাদী বিজেপিশাসিত বেশ কয়েকটি রাজ্যের সরকার শত শত মুসলিমের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণত কোনো এলাকায় ধর্মীয় উত্তেজনা বা মোদি সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পর, এমনকি কখনো কখনো কেবল ধর্মীয় রূপ নেওয়া সাধারণ তর্কের পরেও এমন উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।

ভারতের বৃহত্তম রাজ্য উত্তর প্রদেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজেপির অন্যতম শীর্ষ নেতা যোগী আদিত্যনাথ এখন তাঁর সমর্থকদের কাছে ‘বুলডোজার বাবা’ নামে পরিচিত। হিন্দুত্ববাদী নেতাদের এসব কর্মকাণ্ড সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে যায়। ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি ধ্বংস করেছে এবং বাসিন্দাদের বাস্তুচ্যুত করে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের পথ তৈরি করেছে। গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার সময় প্রায় সব ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি, অফিস, হাসপাতাল, স্কুল এবং উপাসনালয় ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সুমন্ত্র বোস বলেন, ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিশ্বাস ব্যবস্থা জায়নবাদ এবং ইসরায়েলের প্রতি গভীর অনুরাগে সিক্ত। মোদিসহ আরএসএসের প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই আদর্শে দীক্ষিত হয়েছে এবং ইসরায়েলের প্রতি ভালোবাসা ধারণ করেছে।’ বোস যুক্তি দেন, ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় কাঠামো—যাকে তিনি সংখ্যাগুরুবাদী ও শ্রেষ্ঠত্ববাদী হিসেবে বর্ণনা করেছেন—তা-ই হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা মোদি যুগে ভারতে বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলি আদর্শের প্রতিফলন মোদি সরকারের অনেক নীতি ও পদক্ষেপে দেখা যায়।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের মুসলিমরা বিভিন্ন সামাজিক বর্জনের মুখোমুখি হয়েছে। তাদের জন্য বাড়িভাড়া পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে, মুসলিম শিশুরা স্কুলে হয়রানির শিকার হচ্ছে এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হামলার ভয়ে অনেক গ্রাম থেকে পুরো সম্প্রদায় পালিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছেন, সরকার কোনো অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পত্তি আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ধ্বংস করতে পারবে না। তবে, বাস্তবে সরকার আদালতের রায়ে তোয়াক্কা করছে না। বরং এই ধরনের উচ্ছেদ অব্যাহত রয়েছে।

আজাদ এসা বলেন, ভারত ও ইসরায়েল উভয় দেশই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করতে, শাস্তি দিতে এবং একটি রাজনৈতিক বার্তা দিতে ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পদ্ধতি ব্যবহার করছে। ভারত-ইসরায়েল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সামনের সারিতে রয়েছে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এবং একই ধরনের নিরাপত্তা তত্ত্ব। ভারত ইসরায়েলি অস্ত্রের বৃহত্তম ক্রেতা, যা কিনতে তারা শত শত কোটি ডলার ব্যয় করছে।

গাজায় নির্বিচার হামলা ও হত্যাযজ্ঞের মধ্যেও ভারত ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ করছে। ইসরায়েল ভারতীয় সেনাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ড্রোন, বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং উন্নত রাডার ও নজরদারি প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। তবে ভারতের কট্টর নিরাপত্তা সমর্থকদের কাছে ইসরায়েলের আবেদন কেবল উন্নত অস্ত্রের সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পেহেলগামে সশস্ত্রগোষ্ঠীর গুলিতে ২৬ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হওয়ার পর ভারত পাকিস্তান ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের একাধিক স্থানে বোমা হামলা চালায়। ভারতের অভিযোগ, পর্যটকদের ওপর এই হামলার পেছনে ইসলামাবাদ ছিল।

ভারত-ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা যে কারণে ‘ভালো বার্তা’ নয়, সে সম্পর্কেও বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন। ভারত অবশ্য দীর্ঘকাল ধরে তার বিশাল ও বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ডকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে আসছে। উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে শুরু করে কাশ্মীর পর্যন্ত বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন সেখানে রয়েছে। তবে আজাদ এসা আল-জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েল ভারতকে আরও বেশি নিপীড়ক, স্বৈরাচারী এবং সামরিকায়িত হতে প্রযুক্তি ও দক্ষতা দিয়ে সাহায্য করেছে।

কাশ্মীরের চেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ আর কোথাও নেই। বিশ্বের অন্যতম সামরিকায়িত অঞ্চল কাশ্মীর থেকে ২০১৯ সালের আগস্টে শুধু আধা স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদাই নয়, বরং গণতান্ত্রিক ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কাশ্মীরের বিষয়ে রাজনৈতিক সংলাপ বা কূটনৈতিক আলোচনা বন্ধ করার মোদির পদক্ষেপ ইসরায়েলি কৌশলেরই প্রতিফলন। এসা আরও বলেন, কাশ্মীরের সঙ্গে ফিলিস্তিনের অতীত ও বর্তমান আলাদা হলেও বর্তমানে কাশ্মীরের ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের আচরণের সঙ্গে অনেক বেশি মিলে যায়।

এভাবে, কাশ্মীর ও ফিলিস্তিনের পরিস্থিতির মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট, কিন্তু একইসাথে তাদের শাসনের পদ্ধতিতে যে মিল রয়েছে, তা চিন্তার জন্য উদ্বেগজনক। ভারত ও ইসরায়েল উভয় দেশেই নির্দিষ্ট জনগণকে শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা এবং তাদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের কৌশল গ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন