রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬
ব্রেকিং
আন্তর্জাতিক

আর্জেন্টিনায় ফুটবলের অন্ধকার দিক: শিশুদের শোষণ ও অবহেলা

আর্জেন্টিনায় ফুটবল খেলার স্বপ্ন নিয়ে আসা শিশু-কিশোররা শোষণের শিকার হচ্ছে।

আর্জেন্টিনায় ফুটবলের অন্ধকার দিক: শিশুদের শোষণ ও অবহেলা

আর্জেন্টিনায় ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, বরং একটি ধর্ম। লিওনেল মেসি এবং ডিয়েগো ম্যারাডোনার মতো তারকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু-কিশোর বুয়েনস আইরেসে আসেন। কিন্তু এই স্বপ্নের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ বাস্তবতা।

ইএসপিএনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভবিষ্যৎ ফুটবলাররা দারিদ্র্য, অবহেলা এবং শোষণের শিকার হচ্ছেন। বুয়েনস আইরেসের গ্যালার্দো স্ট্রিটের একটি হলুদ বাড়িতে ১২ থেকে ২০ বছর বয়সী তিন ডজনেরও বেশি কিশোর অমানবিক পরিবেশে বাস করছেন। বাড়িটির নিয়ন্ত্রণে থাকা গুস্তাভো হার্নান চোজাস, যিনি 'এল জুরদো' নামে পরিচিত, শিশুদের আইনি অভিভাবক হিসেবে দাবি করে তাদের শোষণ করছেন।

২০২৩ সালে পুলিশ ও সমাজকর্মীরা বাড়িটিতে অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ নোটিশ দিলেও, দুই বছর পরও বাড়িটি সক্রিয় রয়েছে। আর্জেন্টিনার ক্লাবগুলোতে তরুণ খেলোয়াড়দের আবাসন পেনসিওন নামে পরিচিত। ২০১৮ সালে ইন্ডিপেনডিয়েন্ট ক্লাবের পেনসিওনে যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ পায়। তদন্তকারী কর্মকর্তা মারিয়া সোলেদাদ গারিবালদি জানান, ৩০০-র বেশি তরুণের সাক্ষাৎকার নিয়ে জানা যায়, প্রায় ৬০ শতাংশ কিশোর যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।

আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন এবং ক্লাব কর্তৃপক্ষের নীরবতা এই সমস্যা আরও জটিল করেছে। প্রমাণ নষ্ট করা, হুমকি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তদন্ত বছরের পর বছর ধরে ঝুলে রয়েছে। বিচারকরা একে ‘দাসত্বের আধুনিক রূপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

এই শোষণ কেবল আর্জেন্টিনাতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। ডোমিনিকান রিপাবলিকে বেসবল দলগুলো ১১ বছর বয়সী শিশুদের সাথে অবৈধ চুক্তি করছে, চীনে বাস্কেটবল খেলোয়াড়দের শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে এবং আমেরিকায় জিমন্যাস্টিকস ও ফিগার স্কেটিংয়ে দীর্ঘস্থায়ী যৌন নির্যাতনের ইতিহাস রয়েছে।

১৫ বছর বয়সে ফেরো কারিল ওয়েস্তে ক্লাবের সাথে চুক্তি করা তবিয়াস পেরেজ জানান, তিনি আবাসন না পেয়ে এল জুরদোর বাহ্যিক পেনসিওনে পাঠানো হয়েছিলেন। তবিয়াসের বাবা, যিনি একজন দিনমজুর, ছেলের স্বপ্নের জন্য সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছেন। তবিয়াস বলেন, ‘আমরা জানতাম সেখানে খাবার ছিল না, কিন্তু অভিযোগ করলে পেনসিওন বন্ধ হয়ে যাবে এই ভয়ে কাউকে বলিনি।’

আর্জেন্টিনার ফুটবল ব্যবস্থা একটি অর্থনৈতিক মডেলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে যা ক্লাবগুলোকে লাভবান করে, কিন্তু শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। এই অনিয়ন্ত্রিত আবাসনগুলোর ওপর সরকারের কোনো নজরদারি নেই। ফুটবল মাঠের উজ্জ্বল আলোয়ের পেছনে এই অন্ধকার বাস্তবতা যতটা নির্মম, ততটাই উদ্বেগজনক। যতক্ষণ না ফিফা বা স্থানীয় সরকার শিশুদের সুরক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন করছে, ততক্ষণে আরও হাজারো তবিয়াসের স্বপ্ন ও শৈশব ফুটবল সিন্ডিকেটের বলি হতে থাকবে।

বিজ্ঞাপন