বাংলাদেশ থেকে আর্জেন্টিনার দূরত্ব ১৭ হাজার কিলোমিটার, আর ব্রাজিলের প্রায় ১৬ হাজার। ভৌগোলিক কোনো মিল নেই, তবুও বিশ্বকাপ এলেই এই দেশটি যেন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। চায়ের দোকান থেকে ফেসবুক, সবখানেই চলে কথার যুদ্ধ। কিন্তু এই ফুটবল দ্বন্দ্বের শুরুটা কীভাবে হলো?
বহু বছর আগে যখন ইউরোপীয়রা দক্ষিণ আমেরিকায় কলোনি স্থাপন করতে আসে, তখন থেকেই শুরু হয় মাটির দখল নিয়ে রক্তক্ষয়ী লড়াই। স্প্যানিশরা দখল করে আর্জেন্টিনা এবং পর্তুগিজরা ব্রাজিলে। ১৮২৫ সালে শুরু হয় আর্জেন্টাইন-ব্রাজিলিয়ান যুদ্ধ, যা প্রায় তিন বছর ধরে চলেছিল। সেই যুদ্ধের ক্ষত আজও দুই দেশের সংস্কৃতিতে রয়ে গেছে।
১৯১৪ সালে বুয়েনস এইরেসে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে মুখোমুখি হয় এই দুই পরাশক্তি। প্রথম ম্যাচেই ৩-০ গোলে ব্রাজিলকে পরাজিত করে আর্জেন্টিনা। এরপর থেকে মাঠের মারামারি ও বিতর্কের ইতিহাস শুরু হয়। ১৯২৫ সালের কোপা আমেরিকা চলাকালীন মাঠে মারামারি হয়, যার ফলে ৩০ হাজার দর্শকের মধ্যে দাঙ্গা সৃষ্টি হয়।
১৯৩৭ সালে আরেক ম্যাচে আর্জেন্টিনার এক সমর্থক বর্ণবাদী গালি দেন ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের। ১৯৩৯ সালের এক ম্যাচে পেনাল্টি বিতর্ক নিয়ে পুলিশ পাহারায় মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা। এমনকি ১৯৯১ সালের কোপা আমেরিকাতেও এক ম্যাচে রেফারিকে ৫টি লাল কার্ড দেখাতে হয়েছিল।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দ্বন্দ্ব আরও নাটকীয় রূপ নেয়। ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে ঘটে ‘হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল’। ব্রাজিলের ডিফেন্ডার ব্রাংকো পানির বোতল চেয়েছিলেন, যা ঘুমের ওষুধে মেশানো ছিল। সেই সুযোগে আর্জেন্টিনা ম্যাচ জিতে যায়।
দুই দেশের ফুটবল দ্বৈরথকে শতাব্দী ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে কিংবদন্তিরা। ব্রাজিলের পেলের হাত ধরে ৩টি বিশ্বকাপ ট্রফি এবং আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্যে ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ জয়। বর্তমানে নেইমার ও মেসির মধ্যে প্রতিযোগিতা এই দ্বন্দ্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার এই লড়াই কোনো সাধারণ খেলা নয়; এটি ১০০ বছরের ইতিহাস, ঔপনিবেশিক ক্ষোভ ও কোটি কোটি মানুষের আবেগের এক ককটেল। মাঠের লড়াই যতই হিংস্র হোক, দিনের শেষে ফুটবলীয় বিনোদনের সেরা বিজ্ঞাপন এই ম্যাচটাই।