বিশ্ব ফুটবলে ফ্রান্স বর্তমানে একটি প্রতিভার ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি বেলজিয়ামের ডিফেন্ডার থমাস মুনিয়ে মন্তব্য করেন যে, ফ্রান্সের প্রতিভা এতটাই বিস্তৃত যে তারা তিনটি আলাদা দল গঠন করলেও বিশ্বকাপ জয়ের লড়াইয়ে থাকতে পারে।
ফরাসি ফুটবলের বর্তমান বাস্তবতা এই দাবিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেয় না। ট্রান্সফার মার্কেটের হিসাব অনুযায়ী, ফ্রান্সের জাতীয় দলের চূড়ান্ত ২৬ সদস্যের বাইরে থাকা খেলোয়াড়দের নিয়েই একটি শক্তিশালী দল গঠন সম্ভব, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৪১৮ মিলিয়ন ইউরো। এই পরিমাণ বাজারমূল্য পর্তুগাল, ব্রাজিল, নেদারল্যান্ডস এবং বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার চেয়েও বেশি।
ফ্রান্সের ফুটবল সাফল্যের পেছনের গল্পটি কয়েক দশক আগে শুরু হয়। ১৯৩০ থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত বড় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক ব্যর্থতার পর ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন নতুন পথ খোঁজার চেষ্টা করে। জাতীয় দলের কোচ জর্জ বুলোনের উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় ‘সঁত্র দ্য ফরমাসিওঁ’ নামে একটি বিশেষ ফুটবল একাডেমি, যা সরকারের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৭৪ সালে প্রথম একাডেমিটি চালু হয় এবং পরবর্তীতে সারা দেশে ১৬টি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব কেন্দ্রের লক্ষ্য ছিল পেশাদার ফুটবলার ও জাতীয় দলের খেলোয়াড় তৈরি করা। যদিও শুরুর সাফল্য ধারাবাহিক ছিল না, ১৯৮৪ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও অলিম্পিক স্বর্ণ জিতলেও ফ্রান্স ১৯৯০ ও ১৯৯৪ বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়।
১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাসের মোড় ঘুরে যায় যখন বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক ‘ব্ল্যাক-ব্ল্যাঙ্ক-ব্যুর’ দল নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ জিতে। সাবেক গোলরক্ষক ও অধিনায়ক বার্নার্ড লামার মতে, সেই সাফল্যের মূল শক্তি ছিল একাডেমি ব্যবস্থা এবং অভিবাসী পরিবার থেকে উঠে আসা প্রতিভাবান ফুটবলারদের অবদান।
তিনি বলেন, আফ্রিকা, ফরাসি গায়ানা ও মার্টিনিকের মতো অঞ্চল থেকে আসা পরিবারগুলো ফরাসি ফুটবলে সমৃদ্ধি এনেছে। বর্তমানে উসমান ডেম্বেলে ও দেজিরে দুয়ের মতো অনেক খেলোয়াড় ফ্রান্সে জন্ম ও বেড়ে উঠেছেন, যারা জয়ের ক্ষুধা এবং প্রাকৃতিক প্রতিভা নিয়ে গড়ে উঠেছেন।
ফ্রান্সের উন্নয়ন মডেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খেলোয়াড়কেন্দ্রিক পরিকল্পনা। খেলোয়াড়দের শিক্ষা নিশ্চিত করা হয় এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় না, যা তাদের মানসিক বিকাশে সহায়তা করে। বর্তমানে প্যারিসের অসংখ্য বেসরকারি ও অপেশাদার ক্লাবও প্রতিভা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রতিদিনের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বেড়ে ওঠা এসব খেলোয়াড় ফ্রান্সকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিভার কারখানায় পরিণত করেছে।